জাতিসংঘে নতুন মহাসচিব হওয়ার দৌড়ে আছেন যারা

বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের উত্তরসূরি বেছে নিতে প্রস্তুতি নিচ্ছে সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক সংস্থা জাতিসংঘ। আগামী বছর নতুন মহাসচিব নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে, যিনি ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে পাঁচ বছরের জন্য দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন বিশ্ব সংস্থাটির প্রধানের পদে আসতে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন।

বুধবার (২২ অক্টোবর) ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে মহাসচিব নির্বাচনের প্রক্রিয়া এবং কারা এ পদে আগ্রহী তা তুলে ধরেছে।

কখন শুরু হবে প্রক্রিয়া?
সাধারণত বর্তমান মহাসচিবের মেয়াদ শেষ হওয়ার কয়েক মাস আগে জাতিসংঘের ১৫ সদস্যবিশিষ্ট নিরাপত্তা পরিষদ ও ১৯৩ সদস্যবিশিষ্ট সাধারণ পরিষদের সভাপতি যৌথভাবে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর কাছে মনোনয়ন আহ্বান করে চিঠি পাঠাবেন। আগামী বছরের শেষের দিকে ওই চিঠি পাঠানোর কথা রয়েছে। কোনো প্রার্থীকে অবশ্যই কমপক্ষে একটি জাতিসংঘ সদস্য রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে মনোনীত হতে হয়।

ঐতিহ্যগতভাবে মহাসচিবের পদটি অঞ্চলভিত্তিক ঘুরে আসে। ২০২৬ সালে বর্তমান মহাসচিব গুতেরেস (পর্তুগাল) নির্বাচিত হওয়ার সময় পূর্ব ইউরোপের পালা ছিল। এবার লাতিন আমেরিকার পালা বলেই মনে করা হচ্ছে, যদিও অন্যান্য অঞ্চল থেকেও প্রার্থী নির্বাচিত হতে পারেন আশা করছেন কিছু কূটনীতিক।

যারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারেন
নিরাপত্তা পরিষদ এবং সাধারণ পরিষদের সভাপতির চিঠি পাঠানোর আগে পর্যন্ত প্রক্রিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু না হলেও, ইতিমধ্যেই বেশ কয়েকজন প্রকাশ্যে প্রার্থীতা ঘোষণা করেছেন:

মিশেল ব্যাচেলেট (চিলি)
গত ২৩ সেপ্টেম্বর চিলির প্রেসিডেন্ট গ্যাব্রিয়েল বরিক দেশটির সাবেক প্রেসিডেন্ট মিশেল ব্যাচেলেটকে মনোনয়ন দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। ব্যাচেলেট দক্ষিণ আমেরিকার দেশটির প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট ছিলেন এবং দুই দফায় দায়িত্ব পালন করেন। এছাড়াও ২০১০-২০১৩ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘ নারী সংস্থার নির্বাহী পরিচালক এবং ২০১৮-২০২২ সাল পর্যন্ত জাতিসংঘের মানবাধিকার হাইকমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।

রেবেকা গ্রিনস্পান (কোস্টারিকা)
চলতি অক্টোবর মাসের শুরুতে কোস্টারিকা প্রেসিডেন্টে রদ্রিগো চ্যাভেস দেশটির সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট রেবেকা গ্রিনস্প্যানকে মনোনীত করার ঘোষণা দেন। ৬৯ বছর বয়সী রাজনীতিবিদ এবং অর্থনীতিবিদ গ্রিনস্প্যান বর্তমানে জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়ন সম্মেলনের (ইউএসিটিএড) মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।

রাফায়েল গ্রোসি (আর্জেন্টিনা)
জাতিসংঘ পরিচালিত আন্তর্জাতিক পারমাণবিক শক্তি সংস্থা (আইএইএ)-এর মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি দীর্ঘদিন বৈশ্বিক সংস্থাটির মহাসচিব হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। গত সেপ্টেম্বরে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক সাক্ষাতকারে যখন নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেছিলেন, ‘হ্যাঁ, আমি তা করব, হ্যাঁ।’ একজন অভিজ্ঞ আর্জেন্টিনার কূটনীতিক গ্রোসি ২০১৯ সাল থেকে আইএইএর মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

কীভাবে নির্বাচন হবে?
১৫ সদস্যের নিরাপত্তা পরিষদ গোপন ব্যালটে ভোট দেবে, যাকে স্ট্র পোল বলা হয়- যতক্ষণ না তারা একজন প্রার্থীর বিষয়ে ঐকমত্য হয়। প্রতিটি সদস্য প্রার্থীর পক্ষে ‘সমর্থন’, ‘অসম্মতি’ বা ‘মত নেই’ ভোট দিতে পারে। পরে সেই প্রার্থীর নাম সাধারণ পরিষদের কাছে সুপারিশ করবে নিরাপত্তা পরিষদ। ২০১৬ সালে যখন গুতেরেসকে সাধারণ পরিষদে সুপারিশের জন্য নির্বাচিত করা হয়েছিল, তখন নিরাপত্তা পরিষদের একমত হতে ছয়টি স্ট্র পোল লেগেছিল। যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স — এই পাঁচ স্থায়ী সদস্যের (ভেটো ক্ষমতাসম্পন্ন) ঐকমত্যই এখানে মুখ্য।

নিরাপত্তা পরিষদের সুপারিশ পাওয়ার পর সাধারণ পরিষদ আনুষ্ঠানিকভাবে প্রার্থীর নিয়োগ অনুমোদন করবে, যা ঐতিহ্যগতভাবে আনুষ্ঠানিকতাই মাত্র। কারণ সাধারণ পরিষদ কখনও নিরাপত্তা পরিষদ কর্তৃক সুপারিশকৃত প্রার্থীকে নিয়োগ করতে অস্বীকৃতি জানায়নি, তাই বলা যেতে পারে যে নিরাপত্তা পরিষদের নির্বাচন জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব নির্ধারণ করে।

কতটা স্বচ্ছ প্রক্রিয়া?
ইতিহাসে অনেকটাই অস্বচ্ছ এই প্রক্রিয়া এখন আরও স্বচ্ছ করতে কাজ করছে জাতিসংঘ। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের সাধারণ পরিষদে গৃহীত প্রস্তাবে বলা হয়, প্রত্যেক প্রার্থীকে মনোনয়নের সময় তাদের ‘ভিশন স্টেটমেন্ট’ বা কর্মপরিকল্পনা প্রকাশ করতে হবে এবং তা জনসমক্ষে প্রদর্শিত হবে।

জাতিসংঘের কোনো পদে থাকা প্রার্থীদের নির্বাচনের সময় নিজেদের দায়িত্ব থেকে বিরতি নেওয়ার পরামর্শও দেওয়া হয়েছে, যাতে স্বার্থের সংঘাত না ঘটে।

মহাসচিবের দায়িত্ব কী?
জাতিসংঘের সনদে মহাসচিবকে বিশ্ব সংস্থাটির ‘প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা’ বলা হয়েছে। জাতিসংঘের ওয়েবসাইটে এই ভূমিকাকে ‘সমান ভূমিকার কূটনীতিক এবং আইনজীবী, বেসামরিক কর্মচারী এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।

গুতেরেস বর্তমানে ৩০ হাজারেরও বেসামরিক কর্মী এবং ১১টি শান্তিরক্ষা কার্যক্রম তত্ত্বাবধান করেন, যেখানে প্রায় ৬০ হাজার সেনা ও পুলিশ সদস্য রয়েছেন। জাতিসংঘের মূল বার্ষিক বাজেট ৩.৭ বিলিয়ন ডলার, যেখানে শান্তিরক্ষা বাজেট ৫.৬ বিলিয়ন ডলার।

যেহেতু সামরিক ব্যবস্থা বা নিষেধাজ্ঞার অনুমোদন নিরাপত্তা পরিষদের হাতে, তাই মহাসচিবের ক্ষমতা সীমিত। অনেকে কূটনীতিক বলেন, নিরাপত্তা ভেটো ক্ষমতাধারী পাঁচ স্থায়ী সদস্য এমন কাউকেই পছন্দ করেন, যিনি ‘জেনারেল’- র চেয়ে ‘সচিব’ ভূমিকা বেশি পালন করবেন।

জাতিসংঘের ৮০ বছরের ইতিহাসে কোনো নারী মহাসচিব হননি
সম্প্রতি সাধারণ পরিষদে গৃহীত প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ‘দুঃখের সঙ্গে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে কোনো নারী এখনো মহাসচিব পদে নির্বাচিত হননি’। সদস্য দেশগুলো যেন নারীদের প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করে সেই আহ্বান জানানো হয়েছে।

নিউজটি ফেসবুকে শেয়ার করুন ...
fb-share-icon





সম্পর্কিত সংবাদ

  • ১৯ বছর পর কলকাতায় ফিরছেন তসলিমা
  • হরমুজ প্রণালি নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার ঘোষণা ট্রাম্পের
  • খামেনিকে শেষ বিদায় জানাতে তেহরানে জনস্রোত
  • পাকিস্তানের সীমান্তে আফগানিস্তানের হামলা
  • ৩ দেশের নাগরিকদের ভ্রমণ নিষিদ্ধ করল সৌদি
  • সরকারি কর্মকর্তাদের স্মার্টফোন নিষিদ্ধ করল আফগানিস্তান
  • আমৃত্য লড়াইয়ের হুঁশিয়ারি ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর
  • যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সব যোগাযোগ বন্ধ করল ইরান
  • Copy link
    URL has been copied successfully!