দেশে নির্বাচনী প্রচারণার যুদ্ধ শুরু, মানতে হবে যেসব নির্দেশনা

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচারণা শুরু হলো আজ বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) থেকে। এক্ষেত্রে ১ হাজার ৯৭৩ জন প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থী শুরু করবেন প্রচার যুদ্ধ, তবে মানতে হবে ইসির আরচণ বিধি। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় এ নির্বাচনের জন্য প্রার্থীরা পাচ্ছেন টানা ২০ দিনের প্রচারের সুযোগ, যা চলবে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত। প্রচারণা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মাঠে নামছেন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটরা। এরই মধ্যে সংক্ষিপ্ত বিচারের ক্ষমতা নিয়ে সক্রিয় রয়েছে নির্বাচনী তদন্ত কমিটি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিরাপত্তা বাহিনীর তৎপরতাও বাড়ানো হবে।

ইসি জানায়, এবার নির্বাচনে স্বতন্ত্র ও রাজনৈতিক দলের প্রার্থী মিলে মোট প্রতিদ্বন্দ্বি প্রার্থী ১ হাজার ৯৭৩ জন। আদালত থেকে কিছু প্রার্থী বৈধতা পেলে এ সংখ্যা কিছু টা বৃদ্ধি পাবে। এসব নির্বাচনি প্রচারণায় এসকল প্রার্থীকে মেনে চলতে হবে ইসির জারি করা আচরণ বিধিমালা। যদি কোনো প্রার্থী আচরণ বিধি ভঙ্গ করে তাহলে তার প্রার্থীতা বাতিলসহ বিভিন্ন রকম শাস্তি প্রদান করতে পারবে নির্বাচন কমিশন (ইসি)।

এদিকে, আচরণবিধি লঙ্ঘনে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড ও দেড় লাখ জরিমানা এবং দলের জন্য দেড় লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। প্রয়োজনে তদন্ত সাপেক্ষে প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতাও রয়েছে ইসির।

এবারের নির্বাচনে প্রথমবারের মতো পোস্টারবিহীন প্রচারণা চালাতে হবে প্রার্থীদের। সর্বশেষ হালনাগাদ অনুযায়ী, দেশে ভোটার সংখ্যা ১২ কোটি ৭৭ লাখের মতো। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠেয় নির্বাচনে তারা ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পাচ্ছেন। সাম্প্রতিক সময়ের সংসদ নির্বাচনগুলোর চেয়ে এবার অংশগ্রহণকারী দলের সংখ্যাও তুলনামূলক বেশি। এবার ৫৯টি নিবন্ধিত দলের মধ্যে ৫১টি দল প্রার্থী দিয়েছে।

দলগুলো ২,০৯১টি মনোনয়নপত্র দাখিল করেছে এবং স্বতন্ত্র থেকে ৪৭৮টি মনোনয়নপত্র দাখিল করা হয়। যে সব দল প্রার্থী দেয়নি এগুলোর মধ্যে রয়েছে- বাংলাদেশ সাম্যবাদী দল (এমএল), কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, বাংলাদেশ ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, বিকল্পধারা বাংলাদেশ, বাংলাদেশ তরিকত ফেডারেশন, তৃণমূল বিএনপি, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী আন্দোলন-বিএনএম। বুধবার (২১ জানুয়ারি) চূড়ান্ত প্রার্থীদের মধ্যে প্রতীক বরাদ্দ দিয়েছেন রিটার্নিং কর্মকর্তারা।

প্রচারে মানতে হবে যেসব নির্দেশনা-
ভোটের প্রচারে ড্রোন, পোস্টার ব্যবহার, বিদেশে প্রচারণায় নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। ২০টির বেশি বিলবোর্ডে মানা, একমঞ্চে ইশতেহার ঘোষণা ও আচরণবিধি মানতে প্রার্থী ও দলের অঙ্গীকারনামা দিতে হবে। সোশ্যাল মিডিয়ায় ভোটের প্রচারে কড়াকড়ি আরোপ, অসৎ উদ্দেশে এআই ব্যবহারে মানা, পোস্টার ও ড্রোন ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞাসহ কি করা যাবে, কি করা যাবে না, তা তুলে ধরা হয়েছে এ বিধিমালায়।

আচরণবিধি লঙ্ঘনে সর্বোচ্চ ছয় মাসের কারাদণ্ড ও দেড় লাখ টাকা জরিমানা এবং দলের জন্য দেড় লাখ টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। প্রয়োজনে তদন্ত সাপেক্ষে প্রার্থিতা বাতিলের ক্ষমতাও রয়েছে ইসির।

প্রচারণা-সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নির্বাচনী প্রচারণা-
কোনো প্রার্থী বা তার নির্বাচনী এজেন্ট বা প্রার্থীর পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা পরিচালনা করতে পারবেন। তবে এক্ষেত্রে প্রার্থী বা তার নির্বাচনী এজেন্ট বা দল বা প্রার্থী সংশ্লিষ্ট সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নাম, অ্যাকাউন্ট আইডি, ই-মেইল আইডিসহ অন্যান্য সনাক্তকরণ তথ্যাদি উক্তরূপে প্রচার-প্রচারণা শুরুর পূর্বে রিটার্নিং অফিসারের কাছে দাখিল করতে হবে; প্রচার-প্রচারণাসহ নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কোনো বিষয়ে অসৎ উদ্দেশে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহার করা যাবে না; ঘৃণাত্মক বক্তব্য, ভুল তথ্য, কারো চেহারা বিকৃত করা ও নির্বাচন সংক্রান্ত বানোয়াট তথ্যসহ সব ধরনের ক্ষতিকর কনটেন্ট বানানো ও প্রচার করা যাবে না; প্রতিপক্ষ, নারী, সংখ্যালঘু বা অন্য কোনো জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে ঘৃণাত্মক বক্তব্য, ব্যক্তিগত আক্রমণ বা উসকানিমূলক ভাষা ব্যবহার করা যাবে না; নির্বাচনী স্বার্থ হাসিল করার জন্য ধর্মীয় বা জাতিগত অনুভূতির অপব্যবহার করা যাবে না; সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নির্বাচন সংক্রান্ত সব কনটেন্ট শেয়ার ও প্রকাশ করার পূর্বে সত্যতা যাচাই করতে হবে; রাজনৈতিক দল, প্রার্থী বা প্রার্থীর পক্ষে অন্য কোনো ব্যক্তি, ভোটারদের বিভ্রান্ত করার জন্য কিংবা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে কোনো প্রার্থী বা ব্যক্তির চরিত্রহনন কিংবা সুনাম নষ্ট করার উদ্দেশে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা অন্য কোনো মাধ্যমে, সাধারণভাবে বা সম্পাদন (Edit) করে কিংবা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তথা Artificial Intelligence (AI) দিয়ে কোনো মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর, পক্ষপাতমূলক, বিদ্বেষপূর্ণ, অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ এবং মানহানিকর কোনো আধেয় (content) তৈরি, প্রকাশ, প্রচার ও শেয়ার করতে পারবেন না।

আচরণবিধিতে আরও রয়েছে- কোনো দল বা প্রার্থী নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিদেশে জনসভা, পথসভা, সভা-সমাবেশ বা কোনো প্রচারণা করতে পারবে না। ভোটের প্রচারে থাকছে না পোস্টারের ব্যবহার। একজন প্রার্থী তার সংসদীয় আসনে ২০টির বেশি বিলবোর্ড ব্যবহার করতে পারবে না; যার দৈর্ঘ্য হবে সর্বোচ্চ ১৬ ফুট আর প্রস্থ ৯ ফুট। নির্বাচনের দিন ও প্রচারের সময় কোনো ধরনের ড্রোন, কোয়াডকপ্টার বা এ জাতীয় যন্ত্র ব্যবহার করা যাবে না। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী বা তার পক্ষে অন্য কোনো প্রার্থী ও প্রতিষ্ঠান ভোটার স্লিপ বিতরণ করতে পারবে। তবে ভোটার স্লিপে প্রার্থীর নাম, ছবি, পদের নাম ও প্রতীক উল্লেখ করতে পারবে না। বিলবোর্ডে শুধু যেগুলো ডিজিটাল বিলবোর্ড, সেগুলোতে আলোর ব্যবহার করা যাবে। বিদ্যুতের ব্যবহার করা যাবে। তাছাড়া আলোকসজ্জার ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। ব্যানার, ফেস্টুন, লিফলেটে পলিথিনের আবরণ নয়, প্লাস্টিক (পিভিসি) ব্যানার ব্যবহার করা যাবে না। সরকারি সুবিধাভোগী অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির তালিকায় অন্তর্বর্তী/তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, উপদেষ্টা পরিষদের সদস্যদেরও যোগ করা হয়েছে। ফলে তারা প্রার্থীর হয়ে প্রচারে নামতে পারবেন না। প্রচারে পরিবেশবান্ধব সামগ্রী ব্যবহারে জোর দেওয়া হয়েছে; প্রচার সামগ্রীতে পলিথিন, রেকসিনের ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। প্রচারের সময় শব্দের মাত্রা ৬০ ডেসিবেলে রাখতে হবে। আচরণবিধি মেনে চলার ব্যাপারে প্রার্থী ও দলের কাছ থেকে অঙ্গীকারনামাও দিতে হবে। আচরণবিধির ‘গুরুতর’ অপরাধের ক্ষেত্রে আরপিওতে প্রার্থিতা বাতিলের বিধান রয়েছে।

নির্বাচনি প্রচারণা সংক্রান্ত নিয়ম ও সাইজ-

পোস্টার: কোনো ধরনের পোস্টার ব্যবহার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

লিফলেট/হ্যান্ডবিল: কাগজের লিফলেট বিতরণ করা যাবে। সর্বোচ্চ A4 সাইজ (৮.২৭ ইঞ্চি × ১১.৬৯ ইঞ্চি)

যা করা যাবে না: প্লাস্টিক, পলিথিন, রেক্সিন বা পরিবেশ-ক্ষতিকর উপাদানে তৈরি লিফলেট, দেয়াল, গাছ, খুঁটি, যানবাহনে লাগানো, অন্য প্রার্থীর পোস্টার/ব্যানার নষ্ট করা বা ঢেকে দেওয়া যাবে না।

ফেস্টুন: কাপড় বা চটের ফেস্টুন ব্যবহার করা যাবে। সর্বোচ্চ ১৮ ইঞ্চি × ২৪ ইঞ্চি।

করা যাবে না: পিভিসি/প্লাস্টিক ফেস্টুন

দেয়াল, গাছ, খুঁটি, সরকারি স্থাপনায় টানানো।

ব্যানার: সর্বোচ্চ ১০ ফুট × ৪ ফুট। কাপড় বা চটের ব্যানার ব্যবহার করা যাবে। নির্দিষ্ট খালি স্থানে ঝুলানো যাবে (দেয়াল, গাছ, খুঁটি, গাড়ি নয়)।

করা যাবে না: প্লাস্টিক (PVC) ব্যানার

দেয়াল, গাছ, বৈদ্যুতিক খুঁটি, বাস, ট্রাক, রিকশা ইত্যাদিতে লাগানো। অন্য প্রার্থীর ব্যানার নষ্ট করা। ছাপানো হবে এমন ছবি ছাড়া অন্য কারো ছবি (দলীয় প্রধান ছাড়া)

ছবির ব্যবহার করা যাবে: নিজের ছবি। দলীয় মনোনীত হলে কেবল দলীয় প্রধানের ছবি।

করা যাবে না: অন্য কোনো নেতার ছবি। ছবি বড় করে শোভাযাত্রা, প্রার্থনার ভঙ্গিতে, নাটকীয় ভঙ্গিতে। ছবির সর্বোচ্চ সাইজ সাধারণ Portrait ছবি। ৬০ সেমি × ৪৫ সেমি এর বেশি নয়।

প্রতীক: প্রতীকের সর্বোচ্চ সাইজ: দৈর্ঘ্য/প্রস্থ/উচ্চতা ৩ মিটারের বেশি নয়

ভোটার স্লিপ করা যাবে: ১২ সেমি × ৮ সেমি এর বেশি নয়। ভোটারের নাম, নম্বর, কেন্দ্র উল্লেখ করে স্লিপ দেওয়া যাবে।

তবে ভোটকেন্দ্রের ৪০০ গজের ভেতরে বিতরণ করা যাবে না।

করা যাবে না: প্রার্থীর নাম, প্রতীক, ছবি, ভোট চাই এমন লেখা।

ডিজিটাল/সোশ্যাল মিডিয়া প্রচারণা:

ফেসবুক, ইউটিউব, অনলাইন প্রচারণা করা যাবে। তবে শর্ত হচ্ছে, আগে রিটার্নিং অফিসারকে জানাতে হবে (আইডি, পেজ, ইমেইল ইত্যাদি)।

ভুয়া খবর, ঘৃণামূলক কনটেন্ট নিষিদ্ধ।

AI দিয়ে ভুয়া ভিডিও/ছবি বানানো নিষিদ্ধ।

বিদেশি টাকা দিয়ে বিজ্ঞাপন দেওয়া নিষিদ্ধ।

শোডাউন/গাড়িবহর সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ: বাস, ট্রাক, মোটরসাইকেল নিয়ে মিছিল, শোডাউন, মশাল মিছিল, ড্রোন ব্যবহার, হেলিকপ্টার দিয়ে লিফলেট ছড়ানো যাবে না।

আলোকসজ্জা ও গেট নিষিদ্ধ: গেট, তোরণ বানানো যাবে না। আলোকসজ্জা, রাস্তার ওপর ক্যাম্প করা যাবে না।

বড় প্যান্ডেল ৪০০ বর্গফুটের বেশি

ক্যাম্প সংখ্যা সীমা: প্রতি ইউনিয়ন/ওয়ার্ডে সর্বোচ্চ ১টি ক্যাম্প। পুরো নির্বাচনী এলাকায় সর্বোচ্চ ১টি কেন্দ্রীয় ক্যাম্প।

সংক্ষেপে সাইজ তালিকা

ব্যানার: ১০ ফুট × ৪ ফুট

লিফলেট/হ্যান্ডবিল: A4 (৮.২৭″ × ১১.৬৯″)

ফেস্টুন: ১৮″ × ২৪″

ছবি (Portrait): ৬০ সেমি × ৪৫ সেমি

প্রতীক: ৩ মিটারের বেশি নয়

ভোটার স্লিপ: ১২ সেমি × ৮ সেমি
এছাড়া গণমাধ্যমের সংলাপ ও সব প্রার্থীর এক মঞ্চে ইশতেহার ঘোষণার সুযোগ রাখা হয়েছে। রিটার্নিং কর্মকর্তা সংশ্লিষ্ট আসনে সব প্রার্থীকে নিয়ে একদিনে তাদের ইশতেহার বা ঘোষণাপত্রগুলো পাঠ করার ব্যবস্থা করবেন।

নির্বাচন কমিশনের সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও সাবেক নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের সদস্য জেসমিন টুলী এ বিষয়ে বলেন, প্রতীক বরাদ্দ হয়ে গেছে। এখন নির্বাচনী আচরণবিধি প্রতিপালন নিশ্চিত করাই ইসির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

নিউজটি ফেসবুকে শেয়ার করুন ...
fb-share-icon


« (পূর্ববর্তী সংবাদ)



সম্পর্কিত সংবাদ

  • প্রতীক বরাদ্দের আগে নির্বাচনি প্রচারণা করা যাবে না: ইসি
  • গুম থেকে জীবিত ফেরা ৭৫ শতাংশই জামায়াত-শিবিরের: গুম কমিশন
  • খালেদা জিয়া ছিলেন ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়: প্রধান উপদেষ্টা
  • আসন্ন নির্বাচন আয়োজনে ‘আমরা পুরোপুরি প্রস্তুত’ : প্রধান উপদেষ্টা
  • জানুয়ারিতে চালু হচ্ছে ঢাকা-করাচি সরাসরি ফ্লাইট
  • ভোটের আগে কোনো উন্নয়ন প্রকল্প নয়: ইসি
  • দেশের ২৬তম প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী
  • Copy link
    URL has been copied successfully!