সম্পাদকীয়

দক্ষিণ এশিয়ায় সর্বোচ্চ!

নেতিবাচক ক্ষেত্রে ‘সর্বোচ্চ’ হওয়ার মধ্যে কোনো কৃতিত্ব নেই, বরং তা গ্লানিকর। আর এমনই একটি নেতিবাচক খবরের জন্মদাতা হল দেশের ব্যাংকিং খাত। সোমবার সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম) আয়োজিত কর্মশালায় বক্তারা জানিয়েছেন, দক্ষিণ এশিয়ার বৃহৎ অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের হার সবচেয়ে বেশি। শুধু দক্ষিণ এশিয়া নয়- থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার চেয়েও বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের হার বেশি।

আর দেশে প্রতি বছরই এ হার বাড়ছে। এ বক্তব্যে কোনো অতিরঞ্জন নেই। এ সংক্রান্ত সর্বশেষ তথ্য বলছে, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কিছু উদ্যোগ সত্ত্বেও দেশের ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণ তো কমেইনি, বরং তা আরও বেড়েছে।

গত ১ জানুয়ারি থেকে ৩০ জুন পর্যন্ত ছয় মাসে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৫ হাজার ৩৭ কোটি টাকা। ফলে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮৯ হাজার ৩৪০ কোটি টাকায়।

তবে খেলাপি ঋণের প্রকৃত পরিমাণ এর চেয়ে অনেক বেশি বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ ব্যাংকগুলো নানা কৌশল অবলম্বন করে খেলাপির তথ্য গোপন করে থাকে। খেলাপি ঋণ মামলায় আটকে থাকা অবলোপন করা টাকা হিসাবে নিলে খেলাপি ঋণের প্রকৃত অঙ্ক দাঁড়ায় দেড় লাখ কোটি টাকার কাছাকাছি।

সানেমের কর্মশালায় অর্থনীতিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির প্রবণতা অর্থনীতিতে ঝুঁকি তৈরি করছে। এ বক্তব্যের সঙ্গেও আমরা একমত। বিরাট অঙ্কের খেলাপি ঋণ দেশের অর্থনীতিকে ক্রমেই গ্রাস করে ফেলছে। সংকটে ফেলছে ব্যাংকিং খাতকে। এর প্রভাব পড়ছে ঋণ ব্যবস্থাপনায়। ফলে এগোতে পারছেন না ভালো উদ্যোক্তারা। পরিণামে বাড়ছে না বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান। ব্যাংকগুলোর সংকটে পড়ার জন্যও মূলত খেলাপি ঋণ দায়ী।

বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকসের (বিএবি) সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ব্যাংকগুলো ঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে আনতে যে গড়িমসি করছে তার অন্যতম কারণ হল তারল্য সংকট। এ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে তাদের নিয়ম লঙ্ঘনের কারণেই। যারা নিয়মের বাইরে গেছে তারাই তারল্য সংকটে পড়েছে। অর্থাৎ অতিমাত্রায় খেলাপি ঋণ এবং বেপরোয়া ঋণ বিতরণের কারণেই এমনটি হয়েছে।

তবে এতে যে শুধু অর্থনীতিতেই ঝুঁকি তৈরি হয়েছে তা নয়, আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রশ্নের মুখেও পড়তে যাচ্ছে সরকার। জানা গেছে, আগামী রোববার আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফরে আসছে।

সেসময় তারা অর্থ মন্ত্রণালয়, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, পরিকল্পনা বিভাগ ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে বৈঠক করবে। এবার নাকি আইএমএফের বেশি দৃষ্টি থাকবে ব্যাংকিং খাতের ওপর। সংস্থাটির প্রশ্নের তালিকায় অধিকাংশই থাকবে ব্যাংকিং খাতসংক্রান্ত।

স্বভাবতই ঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে বাস্তবায়নের অগ্রগতি, খেলাপি ঋণ কমানোর উদ্যোগ, ফারমার্স ব্যাংকসহ আর্থিক খাতের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হবে। তখন কী জবাব দেবে সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক? সরকার ব্যাংক মালিকদের নানা সুবিধা দেয়ার পরও কেন তারা ঋণের সুদহার সিঙ্গেল ডিজিটে নামাচ্ছেন না এ প্রশ্ন সবার। ব্যাংকগুলো বেপরোয়া খেলাপি ঋণের লাগামই বা কেন টেনে ধরতে পারছে না? আর্থিক খাতের বিপর্যয় ঠেকাতে সরকার ও কেন্দ্রীয় ব্যাংককে এদিকে দৃষ্টি দিতে হবে জরুরিভাবে।

About the author

szaman

Add Comment

Click here to post a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

April 2019
S M T W T F S
« Mar    
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930