হাদিসে ভবিষ্যদ্বাণী: আজ কেন ইলমহীন বক্তা বেশি?
কেয়ামতের ছোট নিদর্শনগুলো একে একে প্রকাশ পাচ্ছে। এর মধ্যে একটি অন্যতম হলো- ইলমহীন বক্তাদের প্রভাব বৃদ্ধি এবং প্রকৃত আলেমদের হ্রাস। রাসুলুল্লাহ (স.) একে কেয়ামতের আলামত হিসেবে বর্ণনা করেছেন। বর্তমান যুগে এই ভবিষ্যদ্বাণীর প্রতিফলন আমরা চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছি।
হাদিসের ভবিষ্যদ্বাণী
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুল (স.) বলেছেন- ‘তোমরা বর্তমানে এমন একটা যুগে আছ, যখন আলেমদের সংখ্যা বেশি এবং বক্তাদের সংখ্যা কম। এই যুগে যে ব্যক্তি তার জানা বিষয়ের এক-দশমাংশ ত্যাগ করবে, সে ধ্বংস হবে। পরে এমন একটা যুগ আসবে যখন বক্তাদের সংখ্যা বেশি হবে এবং আলেমদের সংখ্যা কমে যাবে। তখন যে ব্যক্তি তার জানা বিষয়ের এক-দশমাংশ আঁকড়ে ধরবে, সে নাজাত পাবে।’ (তিরমিজি: ২২৬৭)
ইলম উঠিয়ে নেওয়ার প্রক্রিয়া
ইলম বইয়ের মাধ্যমে মুছে যায় না; বরং আলেমদের মৃত্যুর মাধ্যমে ইলম পৃথিবী থেকে উঠিয়ে নেওয়া হয়। রাসুল (স.) বলেছেন- ‘নিশ্চয় আল্লাহ বান্দাদের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে ইলম তুলে নিবেন না। বরং আলেমদেরকে উঠিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে ইলম উঠিয়ে নিবেন। অবশেষে যখন একজন আলেমকেও তিনি জীবিত রাখবেন না, তখন লোকেরা মূর্খ নেতাদের গ্রহণ করবে। অতঃপর তারা জিজ্ঞাসিত হবে। তখন না জেনেই ফতোয়া দিবে। এভাবে তারা নিজেরা পথভ্রষ্ট হবে এবং অন্যদেরকেও পথভ্রষ্ট করবে।’ (সহিহ বুখারি: ১০০; মুসলিম: ২৬৭৩; মেশকাত: ২০৬)
আজকের বাস্তবতায় হাদিসের প্রতিফলন
১. ইলমহীন বক্তব্যের ছড়াছড়ি: দ্বীনের গভীর জ্ঞান ছাড়াই বক্তব্য দেওয়া, সোশ্যাল মিডিয়ায় ফতোয়া দেওয়া এখন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। কথার চাকচিক্য থাকলেও শরিয়তের ভিত্তি থাকে না।
২. প্রকৃত আলেমদের স্বল্পতা: যাঁরা কোরআন-হাদিসের মূলনীতি ও ব্যাখ্যা জানেন এবং শরিয়াহ মেনে জীবন পরিচালনা করেন—এমন আলেম আজ কম। তাঁদের অবস্থান সমাজে সম্মানজনক হলেও সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পাচ্ছে।
৩. অনুষ্ঠান বাড়ছে, আমল কমছে: ইমাম মালেক (রহ.) বলেছেন- ‘এক সময় মানুষ নামাজ সংক্ষিপ্ত করবে, খুতবা দীর্ঘায়িত করবে এবং আমলের চেয়ে প্রবৃত্তির অনুসরণ করবে।’ (মুয়াত্তা মালেক: ৫৯৭)
কেয়ামতের আরও কিছু আলামত
রাসুলুল্লাহ (স.) বলেছেন, ‘কেয়ামতের অন্যতম নিদর্শন হলো- ১. ইলম উঠিয়ে নেওয়া হবে, ২. অজ্ঞতা ছড়িয়ে পড়বে, ৩. মদ্যপান করা হবে, ৪. ব্যভিচার ব্যাপক হবে।’ (সহিহ বুখারি: ৮০; মুসলিম: ২৬৭১)
এই নিদর্শনগুলো আজ আমাদের সমাজে পরিস্কারভাবে দৃশ্যমান।
সমাধান ও রক্ষার উপায়
১. প্রয়োজনীয় ইলম আঁকড়ে ধরা: হাদিসে বলা হয়েছে- যে যুগে ইলমের অভাব হবে, সেদিন যে নিজের জানা ইলমের সামান্য অংশও আঁকড়ে ধরবে, সে নাজাত পাবে।
২. প্রামাণিক উৎস থেকে জ্ঞান অর্জন: সাময়িক আবেগী বক্তা নয়; বরং নির্ভরযোগ্য ও বিশুদ্ধ আকিদাসম্পন্ন আলেমদের কাছ থেকে জ্ঞান নিতে হবে।
৩. জ্ঞান ও আমলের সমন্বয়: শুধু জানা নয়, জানার ওপর আমল করা, আর প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে বিরত থাকাও অত্যন্ত জরুরি।
রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সতর্কবাণী আজ বাস্তব হয়ে ধরা দিয়েছে। বক্তার সংখ্যা বাড়লেও, সত্যিকার আলেমদের সংখ্যা দিন দিন কমছে। এই সংকটময় সময়ে সঠিক দ্বীনি জ্ঞান অর্জন, সত্যভিত্তিক বক্তার অনুসরণ এবং বিভ্রান্তি থেকে বাঁচাই আমাদের ঈমান রক্ষার পথ। হে আল্লাহ! আমাদেরকে ইলমহীনতা ও বিভ্রান্তি থেকে রক্ষা করুন। প্রকৃত দ্বীন বোঝার ও অনুসরণ করার তাওফিক দিন। আমাদের ঈমান হেফাজত করুন এবং মুসলিম অবস্থায় মৃত্যু দান করুন। আমিন।
সম্পর্কিত সংবাদ
দেশের আকাশে দেখা গেছে রজবের চাঁদ
বাংলাদেশের আকাশে চলতি হিজরি ১৪৪৭ সনের পবিত্র রজব মাসের চাঁদ দেখা গেছে বলে জানিয়েছেন ধর্মবিস্তারিত…
সুরা বাকারার ৪টি মহামূল্যবান দোয়া
দোয়া মুমিনের ঈমানি চেতনার প্রাকৃতিক প্রকাশ। এটিই সেই মাধ্যম, যার মাধ্যমে অসীমের সামনে সসীমের বিনম্রবিস্তারিত…
