রাজনৈতিক

নিখোঁজ ‘ইলিয়াস আলীর’ জনপ্রিয়তায় ইতিহাস গড়লেন মোকাব্বির খান

সিলেট-২ (বিশ্বনাথ ও ওসমানীনগর) আসনে দলীয় প্রতীক (উদীয়মান সূর্য্য) নিয়ে বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করলেন গণফোরামের মোকাব্বির খান। বাংলাদেশে এই প্রথম বারের মতো গণফোরামের কোন প্রার্থী সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলেন।

বিশ্বনাথ ও ওসমানীনগর উপজেলায় গণফোরামের গণভিত্ত্বি না থাকলেও বিএনপি-জামায়াত জোট এবং জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট সমর্থন দেওয়ায় ও স্থানীয় বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীরা তার পক্ষে নির্বাচনী মাঠে কাজ করায় গণফোরামের মোকাব্বির খান বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়েছেন। এটি একটি নিরব ভোট বিপ্লব হয়েছে বলে নির্বাচনী পর্যবেক্ষকেরা মনে করছেন।

সিলেট-২ আসনের ১২৭টি কেন্দ্রে ‘উদীয়মান সূর্য্য’ প্রতীকে ৬৯ হাজার ৪২০ ভোট পেয়ে বেসরকারিভাবে বিজয়ী হয়েছেন মোকাব্বির খান।

তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বি স্বতন্ত্র প্রার্থী আওয়ামী নেতা মুহিবুর রহমান ‘ডাব’ প্রতীকে পেয়েছেন ৩০ হাজার ৪২০ ভোট।

এছাড়া মহাজোটের প্রার্থী জাতীয় পার্টির বর্তমান সংসদ সদস্য ইয়াহ্ইয়া চৌধুরী ‘লাঙ্গল’ প্রতীকে পেয়েছেন ১৮ হাজার ৩২ ভোট, স্বতন্ত্র প্রার্থী আওয়ামী লীগ ঘরনার হিসেবে পরিচিত অধ্যক্ষ ড. এনামুল হক সরদার ‘সিংহ’ প্রতীকে পেয়েছেন ২০ হাজার ৭৪৫ ভোট, খেলাফত মজলিসের প্রার্থী মুহাম্মদ মুনতাছির আলী ‘দেয়াল ঘড়ি’ প্রতীকে পেয়েছেন ৫হাজার ১৭১ ভোট, স্বতন্ত্র প্রার্থী আব্দুর রব মল্লিক ‘কার’ প্রতীকে পেয়েছেন ১হাজার ১৭০ ভোট, ইসলামী আন্দোলনের মোঃ আমির উদ্দিন ‘হাত পাখা’ প্রতীকে পেয়েছেন ১হাজার ৭৪০ ভোট, এনপিপির মনোয়ার হোসাইন ‘আম’ প্রতীকে পেয়েছেন ১হাজার ১৫৬ ভোট ও বিএনএফ’র মোশাহিদ খান ‘টেলিভিশন’ প্রতীকে পেয়েছেন ২৭৬ ভোট।

গতকাল রোববার সকাল ৮টা থেকে বিশ্বনাথ উপজেলার ৭৪টি কেন্দ্রে শুরু হয় ভোট গ্রহন। সকাল থেকে অধিকাংশ ভোট কেন্দ্রে ভোটারদের উপস্থিতি কম থাকলেও দুপুরে ভোটারদের উপস্থিতি বাড়তে থাকে। তবে ভোট কেন্দ্রগুলোতে নারী ভোটারদের উপস্থিতি ছিল লক্ষনীয়। উপজেলার কোথাও কোন কোন ধরণের সহিংসতা বা অপ্রীতিকর ঘটনার খবর পাওয়া যায়নি। তবে কয়েকটি ভোট কেন্দ্রে জাল ভোট প্রদানের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ভোটাররা যাতে নির্বিগ্নে কেন্দ্রে গিয়ে তাদের নিজ নিজ ভোট প্রদান করতে পারেন সেজন্য তৎপর ছিলেন স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তাবৃন্দ। তাই শান্তিপূর্ণভাবে এই আসনে নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে নির্বাচন।

সিলেটের একটি গুরুত্বপূর্ণ আসন হচ্ছে বিশ্বনাথ ও ওসমানীনগর উপজেলা নিয়ে গঠিত সিলেট-২ আসন। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন মোট ১২ জন প্রার্থী। তাদের মধ্যে মনোনয়নপত্র বাচাই, বাতিল, প্রত্যাহার ও সর্বশেষ আপিলে প্রার্থীতা ফিরে পেয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় টিকেন ১০জন প্রার্থী। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী ধানের শীষ প্রতীকে নিখোঁজ বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলীর সহধর্মিনী তাহসিনা রুশদী লুনা। কিন্ত নির্বাচনী প্রচারণার মধ্যখানে আদালত কর্তৃক তাহসিনা রুশদী লুনার প্রার্থীতা স্থগিত হওয়ায় নির্বাচন থেকে ছিটকে পড়েন তিনি। ফলে একাদশ সংসদ নির্বাচনে এই আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন মোট ৯জন প্রার্থী।

এদিকে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এই আসনে ২৩ দলীয় ঐক্যজোট ও ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন কমিশনে মনোনয়নপত্র জামা দেন নিখোঁজ এম ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর লুনা ও তার পুত্র ইলিয়াস আবরার অর্নব। মনোনয়নপত্র বাচাই শেষে ইলিয়াস পুত্র অর্নব মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করলে ধানের শীষের চুড়ান্ত প্রার্থী হয়ে নির্বাচনী মাঠে প্রচার প্রচারণা শুরু করেন তাহসিনা রুশদীর লুনা এবং প্রতীক বরাদ্ধের দিন লুনাকে সমর্থন জানিয়ে যুক্তরাজ্য চলে যান গণফোরামের প্রার্থী মোকাব্বির খান। কিন্ত প্রচার প্রচারণার মধ্যখানে আদালত কর্তৃক লুনার প্রার্থীতা স্থগিত হওয়ায় হতাশ ও নির্বাচন বিমুখ হয়ে পড়েন বিএনপি-জামায়াত জোটের নেতাকর্মীরা। একপর্যায়ে ঐক্যফ্রন্টের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের নির্দেশে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দিতা করতে যুক্তরাজ্য থেকে দেশে ফিরেন গণফোরামের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোকাব্বির খান এবং নির্বাচনের সপ্তাহ খানেক পূর্বে তাকে ২৩ দলীয় জোট ও জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে আনুষ্ঠানিক সমর্থন জানায় বিশ্বনাথ-ওসমানীনগর উপজেলার বিএনপি-জামায়াত।

এরপর থেকে বিএনপি-জামায়াতের নেতাকর্মীরা অনেকটার নিরবে মোকাব্বির খানের ‘উদীয়মান সূর্য্য’ প্রতীকের পক্ষে প্রচার প্রচারণা চালিয়ে যান। অসুস্থ তাহসিনা রুশদীর লুনার নির্দেশে নিখোঁজ এম ইলিয়াছ আলীর ছোট ভাই এম আছকির আলী ও ইলিয়াস পুত্র অর্নব অংশ নেন প্রচারণায়। তারা বিভিন্ন সভা সমাবেশে আবেগময়ী বক্তব্য দেওয়ায় ভোটার সাধারণের মাঝে বিপুল সাড়া জাগে। পাশাপাশি ইলিয়াস আলীর প্রতি এই আসনের ভোটারা বেশ আবেগপ্রবন হওয়ায় ‘ধানের শীষ’ প্রতীকের স্থলে ‘উদীয়মান সুর্য্য’ প্রতীক চলে আসে মূল আলোচনায়।

মোকাব্বির খান বা তাঁর দল এলাকার সাধারণ মানুষের কাছে পরিচিত না হলেও নিখোঁজ ইলিয়াস আলীর প্রতি এই আসনের মানুষের ভালোবাসা ও আবেগ এবং ইলিয়াসপত্নী তাহসিনা রুশদীর লুনার নির্বাচনে অংশগ্রহন করতে না পারার কারণে নিরব ভোট বিপ্লবের মাধ্যমে ‘উদীমান সূর্য্য’ প্রতীকে মোকাব্বির খান বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়েছেন এমনটাই মন্তব্য করেছেন নির্বাচনী পর্যবেক্ষকেরা।

About the author

szaman

Add Comment

Click here to post a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

January 2019
S M T W T F S
« Dec    
 12345
6789101112
13141516171819
20212223242526
2728293031