মুক্তকলাম

ফিরে দেখা ১০টি সংসদ নির্বাচন

আজ ৩০ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত হচ্ছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। এর আগে ১০টি সংসদ নির্বাচন হয়েছে। এ ১০টি নির্বাচনে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) চারবার করে মোট আটবার এবং বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি দুবার জয়লাভ করে সরকার গঠন করে।

আওয়ামী লীগ প্রথম, সপ্তম, নবম ও দশম সংসদ নির্বাচনে; বিএনপি দ্বিতীয়, পঞ্চম, ষষ্ঠ ও অষ্টম সংসদ নির্বাচনে জয়লাভ করে। জাতীয় পার্টি তৃতীয় ও চতুর্থ সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়।

সংসদের মেয়াদ পাঁচ বছর হলেও প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ ও ষষ্ঠ সংসদ রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেনি। তবে পঞ্চম, সপ্তম, অষ্টম, নবম ও দশম সংসদ এর মেয়াদকাল পূরণ করে।

জাতীয় সংসদ নির্বাচনগুলোর মধ্যে ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নবম সংসদ নির্বাচনে সবচেয়ে বেশি ভোট পড়ে। এ নির্বাচনে সর্বোচ্চ ৮৭ শতাংশ ভোট পড়ে। অন্যদিকে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সবচেয়ে কম ভোট পড়ে। এ নির্বাচনে ২৬.৫ শতাংশ ভোট পড়ে।

এ ছাড়া প্রথম সংসদ নির্বাচনে ভোট পড়ে ৫৪.৯ শতাংশ, দ্বিতীয় সংসদ নির্বাচনে ৫১.৩ শতাংশ, তৃতীয় সংসদ নির্বাচনে ৬১.৩ শতাংশ, চতুর্থ সংসদ নির্বাচনে ৫২.৫ শতাংশ, পঞ্চম সংসদ নির্বাচনে ৫৫.৪ শতাংশ, সপ্তম সংসদ নির্বাচনে ৭৫.৪৯ শতাংশ, অষ্টম সংসদ নির্বাচনে ৭৫ শতাংশ ও দশম সংসদ নির্বাচনে প্রায় ৪০ শতাংশ ভোট পড়ে।

১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অধিকাংশ রাজনৈতিক দল বর্জন করে। বিএনপি একতরফাভাবে ২৭৮টি আসনে বিজয়ী হয়। এর মধ্যে ৪৯টি আসনে বিএনপি প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। এ সংসদের মেয়াদ ছিল মাত্র ১১ দিন।

২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বিএনপি ও এর শরিক দলগুলো এ নির্বাচন বর্জন করে। ফলে ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩টি আসনে প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট। সরকারে যোগ দেয় বিরোধী দল জাতীয় পার্টিও।

 

একনজরে ১০টি সংসদের ভোটের ফলাফল

প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন : ১৯৭৩ সালের ৭ মার্চ স্বাধীন দেশে সর্বপ্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে ৩০০টি আসনের মধ্যে ২৯৩টি আসন পেয়ে জয়লাভ করে আওয়ামী লীগ। মোট ১৫টি রাজনৈতিক দল এ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। বিরোধীদের মধ্যে জাতীয় লীগ ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) একজন করে এবং স্বতন্ত্র পাঁচজন প্রার্থী বিজয়ী হন। সংসদ নেতা নির্বাচিত হন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান/মোহাম্মদ মনসুর আলী। এ সংসদের মেয়াদ ছিল দুই বছর ছয় মাস।

দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন : ১৯৭৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি দ্বিতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে বিএনপি ২০৭টি আসন পেয়ে জয়লাভ করে। মোট ৩০টি রাজনৈতিক দল এ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। অন্য দলগুলো পায় ৭৭টি আসন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ (মালেক) ৩৯টি, জাতীয় লীগ দুটি, আওয়ামী লীগ (মিজান) দুটি, জাসদ আটটি, মুসলিম ও ডেমোক্রেটিক লীগ ২০টি, ন্যাপ একটি, বাংলাদেশ গণফ্রন্ট দুটি, বাংলাদেশ সাম্যবাদী দল একটি, বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক দল একটি ও জাতীয় একতা পার্টি একটি আসন পায়। নির্বাচিত বাকি ১৬ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী। সংসদ নেতা নির্বাচিত হন শাহ আজিজুর রহমান। বিরোধীদলীয় নেতা হন আসাদুজ্জামান খান। এ সংসদের মেয়াদ ছিল তিন বছর।

তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন : ১৯৮৬ সালের ৭ মে তৃতীয় জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে জাতীয় পার্টি ১৫৩টি আসন পেয়ে জয়লাভ করে। বিএনপি এ নির্বাচন বর্জন করে। অংশগ্রহণ করে মোট ১৩টি রাজনৈতিক দল। জাতীয় পার্টি বাদে অন্য দলগুলো পায় ১১৫ আসন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ ৭৬টি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) পাঁচটি, ন্যাপ (মোজাফফর) দুটি, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি পাঁচটি, বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) তিনটি, জাসদ (রব) চারটি, জাসদ (সিরাজ) তিনটি, জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ ১০টি, মুসলিম লীগ চারটি ও ওয়ার্কার্স পার্টি তিনটি আসন পায়। বাকি ৩২ আসনে নির্বাচিত হন স্বতন্ত্র প্রার্থী। সংসদ নেতা নির্বাচিত হন মিজানুর রহমান চৌধুরী। বিরোধীদলীয় নেতা হন শেখ হাসিনা। এ সংসদের মেয়াদ ছিল ১৭ মাস।

চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচন : ১৯৮৮ সালের ৩ মার্চ চতুর্থ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ অধিকাংশ রাজনৈতিক দল এ নির্বাচন বর্জন করে। ফলে জাতীয় পার্টি ২৫১টি আসন পেয়ে জয়লাভ করে। নির্বাচনে মোট ছয়টি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করে। ১৯টি আসন পেয়ে সংসদে বিরোধী দলের আসনে বসেন সম্মিলিত বিরোধী দল (কপ)। এ ছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী ২৫টি, জাসদ (সিরাজ) তিনটি ও ফ্রিডম পার্টি দুটি আসন লাভ করে। সংসদ নেতা নির্বাচিত হন মওদুদ আহমেদ/কাজী জাফর আহমেদ। বিরোধীদলীয় নেতা হন আ স ম আব্দুর রব। এ সংসদের মেয়াদ ছিল দুই বছর সাত মাস।

পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন : স্বৈরশাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের পতনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে দুটি প্রধান রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিসহ প্রায় সব রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করে। অংশ নেওয়া দলের সংখ্যা ছিল ২১। এ নির্বাচনে বিএনপি ১৪০টি আসন পেয়ে জয়লাভ করে। আওয়ামী লীগ ৮৮টি, জাতীয় পার্টি ৩৫টি, বাংলাদেশ কৃষক শ্রমিক আওয়ামী লীগ (বাকশাল) পাঁচটি, জাসদ (সিরাজ) একটি, ইসলামী ঐক্যজোট একটি, জামায়াতে ইসলামী ১৮টি, সিপিবি পাঁচটি, ওয়ার্কার্স পার্টি একটি, ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এনডিপি) একটি, গণতন্ত্রী পার্টি একটি ও ন্যাপ (মোজাফফর) একটি আসন পায়। স্বতন্ত্র প্রার্থী তিনটি আসনে জয়লাভ করেন। সংসদ নেতা নির্বাচিত হন খালেদা জিয়া। বিরোধীদলীয় নেতা হন শেখ হাসিনা। সংসদের মেয়াদ ছিল চার বছর আট মাস।

ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন : ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। দলীয় সরকারের অধীনে হওয়া এ নির্বাচন বর্জন করে অধিকাংশ রাজনৈতিক দল। বিএনপি ২৭৮টি আসন পেয়ে একতরফা জয়লাভ করে। মোট তিনটি রাজনৈতিক দল এ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। অন্য দুটি দলের মধ্যে ফ্রিডম পার্টি একটি আসন পায়। বাকি ১০ আসনে জয়লাভ করেন স্বতন্ত্র প্রার্থী। এ ছাড়া ১০টি আসনে ফলাফল অসমাপ্ত ছিল এবং একটি আসনের নির্বাচন আদালতের আদেশে স্থগিত করা হয়। সংসদ নেতা হন খালেদা জিয়া। এ সংসদের মেয়াদ ছিল মাত্র ১১ দিন।

সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন : ১৯৯৬ সালের ১২ জুন সপ্তম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১৪৬টি আসনে জয়লাভ করে। এটি ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন। মোট আটটি রাজনৈতিক দল এ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। অন্য দলগুলোর মধ্যে বিএনপি ১১৬টি, জাতীয় পার্টি ৩২টি, জামায়াতে ইসলামী তিনটি, ইসলামী ঐক্যজোট একটি ও জাসদ একটি আসন পায়। স্বতন্ত্র প্রার্থী জয়লাভ করেন একটি আসনে। সংসদ নেতা নির্বাচিত হন শেখ হাসিনা। বিরোধীদলীয় নেতা হন খালেদা জিয়া। সংসদের মেয়াদ ছিল পাঁচ বছর।

অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন : ২০০১ সালের ১ অক্টোবর অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচন অনুষ্ঠানের সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান ছিলেন লতিফুর রহমান। নির্বাচনে বিএনপি ১৯৩টি আসন পেয়ে সরকার গঠন করে। মোট ১৯টি রাজনৈতিক দল এ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। বিএনপি বাদে অন্য দলগুলোর মধ্যে আওয়ামী লীগ ৬২টি, জামায়াতে ইসলামী ১৭টি, জাতীয় পার্টি ও ইসলামী জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ১৪টি, জাতীয় পার্টি (না-ফি) চারটি, জাতীয় পার্টি (মঞ্জু) একটি, ইসলামিক ঐক্যজোট দুটি, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ একটি আসন পায়। বাকি ছয় আসনে জয়লাভ করেন স্বতন্ত্র প্রার্থী। সংসদ নেতা নির্বাচিত হন খালেদা জিয়া। বিরোধীদলীয় নেতা হন শেখ হাসিনা। সংসদের মেয়াদ ছিল পাঁচ বছর।

নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন : ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ফখরুদ্দিন আহমদের অধীনে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ২৩০টি আসন পেয়ে জয়লাভ করে। মোট ১০টি রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে। আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য দলগুলোর মধ্যে বিএনপি ৩০টি, জাতীয় পার্টি ২৭টি, জাসদ তিনটি, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি দুটি, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) একটি, জামায়াতে ইসলামী দুটি, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) একটি আসন পায়। স্বতন্ত্র প্রার্থী জিতেছেন চার আসনে। সংসদ নেতা নির্বাচিত হন শেখ হাসিনা। বিরোধীদলীয় নেতা হন খালেদা জিয়া। সংসদের মেয়াদ ছিল পাঁচ বছর।

দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন : ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এ নির্বাচনে মোট ১৪৭টি আসনে ভোটগ্রহণ হয়। বিএনপির ও এর নেতৃত্বাধীন জোট নির্বাচন বর্জন করে। ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় পায় আওয়ামী লীগ ও এর শরিক দলগুলো। এ নির্বাচনে মোট ১৭টি রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করে। ভোট নেওয়া হয় ১৪৭টি আসনে। এর মধ্যে আওয়ামী লীগ ৯৬টি, জাতীয় পার্টি ১২টি, ওয়ার্কার্স পার্টি চারটি ও জাসদ দুটি আসন পায়। আর ১৪ আসনে জয়লাভ করেন স্বতন্ত্র প্রার্থী। আওয়ামী লীগ মোট ২৩৪টি আসন পায়। দলটি ১৪ জোটের শরিকদের নিয়ে সরকার গঠন করে। শরিকদের মধ্যে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি ছয়টি, জাসদ (ইনু) পাঁচটি, জাতীয় পার্টি (জেপি-মঞ্জু), তরীকত ফেডারেশন দুটি আসন পায়। জাতীয় পার্টি পায় ৩৪টি আসন। সংসদ নেতা নির্বাচিত হন শেখ হাসিনা। বিরোধী দলের নেতা হন রওশন এরশাদ। বর্তমান সংসদ চলমান।

About the author

szaman

Add Comment

Click here to post a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

April 2019
S M T W T F S
« Mar    
 123456
78910111213
14151617181920
21222324252627
282930