সদকাতুল ফিতরের পরিচয় ও আদায় পদ্ধতি

পবিত্র রমজান মাসে বিশেষ কিছু আমল রয়েছে। সাদকাতুল ফিতর একটি অন্যতম ইবাদত। ঈদের দিন গরিবদের খাবারের জন্য শরীয়ত প্রদত্ত একটি ব্যবস্থাপত্র এই ফিতরা।

সাদকাতুল ফিতর সম্পর্কে নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা এ দিনটিতে তাদেরকে অন্যের কাছে চাওয়া থেকে বিরত রাখো’। জাকাতের মতো এটিও দরিদ্র মানুষের ওপর মহান আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত আমলি সহযোগিতা। ইসলামি শরীয়তের হুকুম মোতাবেক ঈদের দিনের ফজরের নামাজের আগে পর্যন্ত যে সন্তান জন্মগ্রহণ করবে তারও ফিতরা আদায় করা ওয়াজিব।

ফিতরা কি? ফিতরা বা ফেতরা আরবি শব্দ, যা ইসলামে জাকাতুল ফিতর (ফিতরের জাকাত) বা সাদাকাতুল ফিতর (ফিতরের সদকা) নামে পরিচিত। ফিতর বা ফাতুর বলতে খাদ্যদ্রব্য বোঝানো হয়, যা দ্বারা রোজাদাররা রোজা ভঙ্গ করেন। (আল মুজাম আল ওয়াসিত, পৃষ্ঠা ৬৯৪)। ইসলামি শরীয়তের হুকুম মোতাবেক এটি একটি ওয়াজিব আমল। ঈদুল ফিতরের দিন সুবহে সাদিকের সময় পর্যন্ত জীবিকা নির্বাহের অত্যাবশকীয় সামগ্রী ছাড়া নিসাব পরিমাণ বা অন্য কোনো পরিমাণ সম্পদের মালিকদের পক্ষ থেকে গরিবদের জন্য নির্দিষ্ট পরিমাণের একটি অর্থ প্রদান করার বিশেষ আয়োজনকে সাদকাতুল ফিতর বলা হয়। জনপ্রতি আধা সা অর্থাৎ এক সের চৌদ্দ ছটাক বা পৌনে দুই সের গম বা সমপরিমাণ গমের মূল্য ফিতরা হিসেবে প্রদান করতে হবে।

ফিতরার পরিমাণ: নবীজি (সা.) এর যুগে মোট চারটি পণ্য দ্বারা সাদকাতুল ফিতর আদায় করা হতো, খেজুর, কিশমিশ, জব ও পনির। হজরত আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বলেন, আমাদের সময় ঈদের দিন এক সা খাদ্য দ্বারা সাদকা আদায় করতাম। আর তখন আমাদের খাদ্য ছিল জব, কিশমিশ, পনির ও খেজুর। (সহিহ বোখারি)। রাসূল (সা.) এর যুগে গমের ভালো ফলন ছিল না বিধায় আলোচিত চারটি পণ্য দ্বারাই ফিতরা আদায় করা হতো। এরপর হজরত মুয়াবিয়ার (রা.) যুগে গমের ফলন বেড়ে যাওয়ায় গমকে আলোচিত চারটি পণ্যের সঙ্গে সংযোজন করা হয়। আর তখন গমের দাম ছিল বাকি চারটি পণ্যের তুলনায় বেশি। আর মূলত এই দাম বেশি থাকার কারণেই হজরত মুয়াবিয়া গমকে ফিতরার পণ্যের তালিকভুক্ত করেছিলেন। অতএব, গম দ্বারা আদায় করলে আধা সা বা এক কেজি ৬২৮ গ্রাম দিলেই ফিতরা আদায় হয়ে যাবে। আর বাকি চারটি পণ্য অর্থাৎ খেজুর, জব, পনির ও কিশমিশ দ্বারা আদায় করার ক্ষেত্রে জনপ্রতি এক সা বা তিন কেজি ২৫৬ গ্রাম দিতে হবে। গম ছাড়া অন্য পণ্য দ্বারা ফিতরা আদায় করলে এক সা পরিমাণ দিতে হচ্ছে, যা গমের ওজনের দ্বিগুণ এবং মূল্যের দিক দিয়েও অনেক তফাত। হাদিসে এক সা আদায় করার কথা উল্লেখ থাকার পরও তখন গমের মূল্য অনেক বেশি হওয়ায় সাহাবারা আধা সা পরিমাণ গম আদায়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

তাহলে এখন প্রশ্ন হলো, অন্য চারটি পণ্য হিসাব না করে শুধু গমের পরিমাণ হিসেবে ফিতরা আদায় করা যৌক্তিক হচ্ছে তো? হাদিসের আলোচনা থেকে এ কথাটি স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়, সাহাবারা খেজুর, জব, পনির ও কিশমিশ থেকে হলে এক সা পরিমাণ এবং গম থেকে হলে আধা সা পরিমাণ ফিতরা আদায় করতেন। কারণ তখন গমের দাম অন্যসব পণ্যের তুলনায় বেশি ছিল। আর বর্তমানে অন্য চারটি পণ্যের তুলনায় গমের দাম কম। এ পর্যন্ত হাদিসের এমন কোনো সূত্র পাওয়া যায়নি যে সাহাবারা সবাই সর্বনিম্ন দামের বস্তু দ্বারা ফিতরা আদায় করেছেন। বরং তাদের সবার আগ্রহ ছিল সর্বাধিক দামি পণ্য দ্বারা ফিতরা আদায় করা। তাহলে বর্তমানে সবাই সর্বনিম্ন দামের পণ্য দ্বারা ফিতরা আদায় করছে কেন? বেশি সম্পদশালী এবং কম সম্পদশালী নির্বিশেষে গম বা সর্বনিম্ন দামের পণ্য দ্বারা সাদকাতুল ফিতর আদায় করার বিষয়টি বিবেকবর্জিত এবং হাদিস ও শরীয়তের নির্দেশনার পরিপন্থি। সবার উচিত সামর্থ্য অনুযায়ী সাদকাতুল ফিতর আদায় করা এবং দায়সারা আদায় পদ্ধতি ত্যাগ করা।

যার সামর্থ্য আছে উন্নতমানের খেজুর দ্বারা সে খেজুর দ্বারাই আদায় করবে। আর যার সামর্থ্য আছে কিশমিশ কিংবা জব দ্বারা আদায় করার সে তা দ্বারা আদায় করবে। যার গম দ্বারা আদায় করা ছাড়া অন্য পণ্য দ্বারা আদায় করার সামর্থ্য নেই সে গম দ্বারা ফিতরা আদায় করবে। বেশি সম্পদশালী এবং কম সম্পদশালী নির্বিশেষ গম বা সর্বনিম্ন দামের পণ্য দ্বারা সাদকাতুল ফিতর আদায় করার বিষয়টি বিবেকবর্জিত এবং হাদিস ও শরীয়তের নির্দেশনার পরিপন্থী।

ফিতরা কারা দেবেন: নারী-পুরুষ, স্বাধীন-পরাধীন, শিশু-বৃদ্ধ, ছোট-বড় সব মুসলিমের জন্য ফিতরা প্রদান করা ওয়াজিব। ইবনে ওমর (রা.) থেকে জানা যায়, রাসূল (সা.) প্রত্যেক স্বাধীন-ক্রীতদাস, নারী-পুরুষ, ছোট-বড় মুসলমানের জাকাতুল ফিতর এক ‘সা’ পরিমাণ খেজুর বা যব ফরজ করেছেন। তিনি লোকদের ঈদের নামাজে বের হওয়ার পূর্বেই তা আদায় করার আদেশ দিয়েছেন। (বুখারি ও মুসলিম)। ফিতরা দেয়ার সামর্থ্য আছে (এক দিন ও এক রাতের খাদ্যের অতিরিক্ত পরিমাণ সম্পদ থাকলে) এ রকম প্রত্যেক ব্যক্তিকে নিজের ও পরিবারের সব সদস্যের পক্ষ থেকে ফিতরা প্রদান করা ফরজ, যাদের লালন-পালনের দায়িত্ব শরীয়ত কর্তৃক তার ওপরে অর্পিত হয়েছে। (আল মুগনী, ৪/৩০৭)। যার নিকট এক দুই বেলার খাবার ব্যতীত অন্য কিছু নেই তার ফিতরা দেয়ার প্রয়োজন নেই। সৌদি ফাতাওয়া বোর্ড, ৯/৩৮৭)।

কে ফিতরা পাবে: গরিব, দুস্থ, অসহায়, অভাবগ্রস্ত ব্যক্তিরাই ফিতরার দাবিদার। তবে যার জন্য জাকাত খাওয়া জায়েজ এবং যার ওপর জাকাত ওয়াজিব নয়, এমন ব্যক্তিকে ফিতরা প্রদান করা যাবে।

কাজের লোকের ফিতরা দেয়া: বেতনভুক্ত কাজের ব্যক্তির পক্ষে ফিতরা প্রদান করা মালিকের ওপর আবশ্যক নয়। তবে মালিক ইচ্ছা করলে কাজের লোককে ফিতরা প্রদান করতে পারবেন। তবে তিনি বেতন বা পারিশ্রমিক হিসেবে ফিতরা প্রদান করতে পারবেন না।

যা দিয়ে ফিতরা দেয়া যাবে: আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বলেন, আমরা নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে জাকাতুল ফিতর দান করতাম এক সা খাদ্যদ্রব্য কিংবা এক সা যব কিংবা এক সা খেজুর কিংবা এক সা পনির কিংবা এক সা কিশমিশ। (বুখারি, হাদিস ১৫০৬)। এই হাদিসে খেজুর ও যব ছাড়া আরো যে কয়েকটি বস্তুর নাম পাওয়া গেল তা হলো, কিশমিশ, পনির এবং খাদ্যদ্রব্য। উল্লেখ থাকে যে, নবী (সা.) এর বিগত হওয়ার পর মুয়াবিয়া (রা.) এর খেলাফতে অনেকে গম দ্বারাও ফিতরা দিতেন। (বুখারি, হাদিস ১৫০৮)।

খাদ্যদ্রব্য দিয়ে ফিতরা দেয়া: সাহাবি আবু সাঈদ খুদরি বর্ণিত হাদিস থেকে জানা যায়, খাদ্যদ্রব্য দিয়ে ফিতরা প্রদানের কথা। যেহেতু চাল বাংলাদেশসহ ভারতীয় উপমহাদেশের প্রধান খাদ্য সেহেতু চাল দিয়েও ফিতরা প্রদান করা যাবে। চালের বদলে ধান দিয়ে ফিতরা দিতে হলে ওজনের ব্যাপার মাথায় রাখতে হবে। কারণ এক সা ধান এক সা চালের সমমূল্যের হবে না। কোরআন থেকে জানা যায়, তোমরা খাদ্যের খবিস (নিকৃষ্ট) অংশ আল্লাহর পথে খরচ করার সঙ্কল্প কর না। কেননা, তোমরা স্বয়ং উহা গ্রহণ করতে প্রস্তুত নও। (সূরা বাক্বারাহ, আয়াত ২৬৭)। তবে ধানের থেকে চাল দিয়ে ফিতরা প্রদান করা উত্তম। নিম্নোক্ত কিয়াস থেকে এই ব্যাপারে ধারণা পাওয়া যায়, যবের ওপর কিয়াস (অনুমান) খাটিয়ে ধানের ফিতরা জায়েজ হবে না, কারণ ধান আদৌ আহার্য সামগ্রী ‘তাআম’ নয়। আহার্য বস্তুর ওপর কিয়াস করে যব বা খুরমার ফিতরা দেয়া হয় না, মনসূস (কোরআন বা হাদিসে স্পষ্টভাবে উল্লেখিত) বলে দেয়া হয়ে থাকে। তাআম বা আহার্য সামগ্রীরূপে ফিতরা দিতে হলে এক সা চাল দিতে হবে। (তর্জুমানুল হাদিস, ২য় বর্ষ, ৩য় সংখ্যা, রবিউল আওয়াল, ১৩৭০ হি.)।

টাকা দিয়ে ফিতরা দেয়া: নবীজির (সা.) যুগে মুদ্রা হিসেবে দিরহাম প্রচলিত ছিল। দিরহামের দ্বারা কেনাকাটা, দান খয়রাত করা হতো। তবু খুদরি বর্ণিত হাদিস থেকে জানা যায়, নবীজি (সা.) খাদ্যবস্তু দিয়ে ফিতরা প্রদান করতেন। এজন্য ইসলামবেত্তাদের বড় অংশ টাকা দিয়ে ফিতরা প্রদানের ব্যাপারে ভিন্নমত পোষণ করেন। ইমাম আহমদ (রহ.) বলেন, রাসূল (সা.) এর সুন্নতের বরখেলাফ হওয়ার কারণে আমার আশঙ্কা হচ্ছে যে, তা যথেষ্ট হবে না। (মুগনী, ইবনু কুদামাহ, ৪/২৯৫)। তবে প্রয়োজনে টাকা দিয়েও ফিতরা আদায় করা বৈধ। বাংলাদেশের মুসলিমরা টাকা দিয়ে ফিতরা আদায় করতে চাইলে ২.৪০ (দুই কেজি চল্লিশ গ্রাম) মধ্য মানের চাউলের মূল্য পরিশোধ করতে হবে। অবশ্য বাংলাদেশ ইসলামি ফাউন্ডেশন প্রতিবছর শহর ও গ্রাম এলাকার জন্য ফিতরার মূল্য নির্ধারণ করে দেয়। তবে সম্ভব হলে ধান বা খাদ্যবস্তু দিয়ে ফিতরা প্রদান করা উচিত।

সা ও অর্ধ সা: ফিতরা প্রদানের পরিমাপ সংক্রান্ত আলোচনায় সা বহুল আলোচিত শব্দ। সা হচ্ছে আরব দেশে ওজন বা পরিমাপে ব্যবহিত পাত্র। বাংলাদেশে যেমন ধান পরিমাপের জন্য একসময় কাঠা ব্যবহিত হতো। একজন মাঝামাঝি শারীরিক গঠনের মানুষ অর্থাৎ অধিক লম্বা নয় এবং খাটোও নয়, এই রকম মানুষ তার দুই হাত একত্রে করলে যে অঞ্জলি গঠিত হয়, ওই রকম পূর্ণ চার অঞ্জলি সমান হচ্ছে এক সা। (ফাতাওয়া মাসায়েল/ ১৭২-১৭৩)। হাদিস থেকে সুস্পষ্ট জানা যায় মোহাম্মদ (সা.) এক সা পরিমাণ ফিতরা প্রদানের কথা। মোহাম্মদ (সা.) এবং চার খলিফার মৃত্যুর পর মুয়াবিয়া (রা.) ইসলামি রাষ্ট্রের খলিফা নির্বাচিত হন এবং ইসলামি রাষ্ট্রের রাজধানী মদিনা থেকে দামেস্ক স্থানান্তরিত করেন, তখন তারা গমের সঙ্গে পরিচিত হন। সেকালে সিরিয়ার গমের মূল্য খেজুরের দ্বিগুণ ছিল। তাই খলিফা মুয়াবিয়া একদা হজ বা ওমরা করার সময় মদিনায় এলে মিম্বরে বলেন : আমি অর্ধ সা গমকে এক সা খেজুরের সমতুল্য মনে করি। লোকেরা তার এই কথা মেনে নেয়। এরপর থেকে মুসলিম জনগণের মধ্যে অর্ধ সা ফিতরার প্রচলন শুরু হয়। (মুসলিম, অধ্যায় : জাকাত, অনুচ্ছেদ : জাকাতুল ফিতর, হাদিস ২২৮১- ৮২)।






Related News

  • নভেম্বর থেকেই উন্মুক্ত হচ্ছে মক্কা
  • সীমিত পরিসরে চালু হচ্ছে পবিত্র ওমরাহ
  • যথাযথ মর্যাদায় পালিত হলো পবিত্র আশুরা
  • সামাজিক দূরত্ব মেনে তাওয়াফ করলেন হাজিরা
  • এবার হজে খুতবা দেবেন আবদুল্লাহ বিন সোলায়মান
  • অবশেষে খুলে দেয়া হচ্ছে হাফিজিয়া মাদরাসা
  • ১২ জুলাইর পর ফেরত দেয়া হবে হজ নিবন্ধনের টাকা
  • পবিত্র ঈদুল ফিতর আজ
  • %d bloggers like this: