ফেসবুক থেকে বুলেটিন

আত্মহত্য এমন একটা মৃত্যু চাই না

মারিয়া, ঢাবি ::

আমার আন্টির পাশের বাসার এক মহিলা স্বামীর সাথে ঝগড়া করে হারপিক খেয়েছে কিন্তু কিছুক্ষণই পরই তার হুশ হয়েছে এটা সে কী করল! ততক্ষণে তার খাদ্যনালী, পাকস্থলীতে ভয়ানক যন্ত্রণা শুরু হয়েছে। তিনি বাড়ির সবাইকে জানালেন তিনি হারপিক খেয়েছেন। তাকে হাসপাতালে নেয়া হল। হাসপাতাল বেশ দূরে। তিনি ডাক্তারের পা ধরে অনুরোধ করতে শুরু করলেন তাকে বাঁচানো হোক। গগণবিদারী চিৎকারে ভারী হল বাতাস। ডাক্তার জানালেন, ওয়াশ করা যাবে না কারণ পাকস্থলী ভয়ংকরভাবে ফুটো হয়ে গেছে। পরিমাণে অনেক বেশি খেয়েছে এবং হাসপাতালে আনতে অনেক দেরি হয়ে গেছে। যতক্ষণ তার শ্বাস ছিল তিনি বেঁচে থাকার আকুতি জানিয়েছিলেন অথচ মুক্তি পাওয়ার আশায় তিনি এই পথ বেছে নিয়েছিলেন। তিনি বিদায়কালে হাসতে হাসতে বলতে পারেননি, ” জীবন আমি তোমাকে ঘৃণা করি। এবার আমার মুক্তি মিলেছে।”
.
অন্য একজন মহিলার কথা জানি তিনি গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিলেন। মারা যাননি। আধমরা অবস্থায় হাসপাতালে নেয়া হল। সারা গায়ে গজ দিয়ে পেঁচিয়ে রাখা হল। দগদগে চামড়ার সাথে গজ লেপ্টে থাকে। ড্রেসিং করার সময় গজে পানি ভিজিয়ে খুলতে হয়। এতে গজের সাথে দগদগে চামড়া,মাংসপেশী উঠে আসে। তিনিও হাসিমুখে বলতে পারেননি ” জীবন ঘৃণা করি তোমাকে।”
.
সত্যি বলতে আমি নিজেও অনেক হতাশায় থাকি। হতাশার মাত্রা যখন চাল ফুঁড়ে আকাশ ছুঁই ছুঁই করে আমি ডুব দেই। প্রথমত,সোশ্যাল মিডিয়া থেকে ডুব দেই কারণ আমি জানি এটা আমাদের হতাশার মাত্রা বাড়িয়ে দেয়ার শক্তিশালী ভূমিকা পালন করছে। এই সোশ্যাল মিডিয়া আমাদের কুত্তাপাগল করে ফেলেছে। আপনার চাকরী হচ্ছে না,বিয়ে হচ্ছে না,সিজিপিএ কম,পারিবারিক অবস্থা খারাপ ঠিক তখন আমরা খুঁজে খুঁজে বের করি কারা আমার চেয়ে ভালো আছে। আমার ক্ষেত্রেও তাই হয়।
.
প্রেমে ছ্যাকা খেয়ে আমরা কানে হেডফোন গুঁজে শুনি ” কেন পিরীতি বাড়াইলারে বন্ধু।” পড়ি কিছু আবেগী গল্প,কবিতা। চরম হতাশায় কতবার আমরা জায়নামাজে সিজদাহ দিয়ে বলেছি ” বিপদ থেকে রক্ষা কর আল্লাহ”। কতবার আপনি মন্দিরে মাথা ঠুকে বলেছেন ” রক্ষা কর প্রভু ” উত্তর হচ্ছে একবারও না৷ আমরা আমাদের ভালো থাকার চাবি অন্যের হাতে দিয়েছি। নিজেরা হয়েছি চাবি দেয়া পুতুল। যোগ্যতার চেয়ে প্রত্যাশা বেশি রেখে সেই মাত্রা বাড়িয়েছি আরও বহুগুণ। আপনি অমুক জায়গায় পড়েন সুতরাং আপনাকে অমুক তমুক হতে হবে সারাদিন এগুলো বলে বলে মাথা আরও খারাপ করে দিচ্ছে৷ আমার যোগ্যতা আছে কিনা,ইচ্ছে কিনা সেসবের কোন গুরুত্ব নেই। খারাপ রেজাল্টে আপনার বিশ্বস্ত বন্ধুও হয়ত হাসাহাসি করে, সম্মানিত শিক্ষকগণ টিপ্পনি কাটে। দরিদ্রতার কষাঘাতে পিষ্ট হচ্ছে কতজন হিসেব নেই। অনেকের জীবন ভয়ঙ্কর জটিল আমি জানি তবুও কাছের মানুষগুলোর কাছে নিজের কথা বলুন। প্লিজ বলুন৷ আরও একটা প্রত্যাশিত ভোর আমাদের অপেক্ষায় আছে। শুভ্র শিশির,কুলকুল করে বয়ে চলা নদীর জল, বিশাল অরণ্য সব সময় বিস্বাদ লাগবে না বিশ্বাস করুন।
.
যখন খুব হতাশ লাগে তখন আম্মাকে ফোন দেই। মিনমিনে গলায় বলি, ” কী কর আম্মা? ” আম্মা উত্তর দেন ” তোমার
আব্বা বড় বড় কৈ মাছ এনেছেন। সেগুলো কাটছি। ফ্রিজে রেখে দেব। তুমি আসবে তারপর রান্না করব।” আমি কপট রাগ দেখিয়ে বলি, ” তোমরা খাও। আমার আসতে অনেক দেরি।”
একটু পর আবার ফোন দেই। আবারও এবং আবারও। আমার উদ্দেশ্য মা বাবার কণ্ঠ শোনা। ওপাশে আবেগী কণ্ঠস্বর ভেসে আসে,” তোমাকে দেখতে খুব ইচ্ছে করছে। তোমার তো পরীক্ষা আসতে পারবে না। এটা সেটা রান্না করে তোমার আব্বার কাছে পাঠিয়ে দেব।”
আমি রিনরিনে গলায় বলি, ” আব্বাকে আসতে হবে না। অসুস্থ হয়ে যাবে।”
মায়ের কণ্ঠস্বর ভারী হয়।
একটু পর ফোন দিয়ে বলি, ” আব্বাকে আসতে নিষেধ করেছি এইজন্য কারণ কাল আমি নিজেই আসব।” কিছুদিন আগে আমি হুট করে এভাবেই বাসায় চলে গিয়েছিলাম কারণ জানতাম ওখানে গেলেই আমি ভালো থাকব। আমাকে কোনদিন মা বাবা ধমক টমক দেননি, কোন বিষয়ে নিরুৎসাহিত করেননি কিন্তু আমার এইভেবে হতাশ লাগে আমি তাঁদের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারব না হয়ত। আমার অ্যাবনরমাল ভাইটাকে যখন আমার হাতে তুলে দিয়ে বলে, ” তুমি ওর দায় দায়িত্ব নেবে আমরা না থাকলে। ” বিশ্বাস করুন আমার তখন প্রচন্ড হতাশ লাগে এই ভেবে আমি যদি ওর জন্য কিছু করতে না পারি তাহলে আমার বেঁচে থাকার সার্থকতা কোথায়? আমার বাজে অ্যাকাডেমিক রেজাল্ট এই দিয়ে শেষ পর্যন্ত কী হবে জানি না পরক্ষণেই ভাবি, কাল ভোরে আমি সূর্যালোক দেখব কিনা সেটাও তো আমি জানি না।
.
আমার যেকোন বিপদে আমার প্রিয় রুমমেটরা আছে,ডিপার্টমেন্টের বন্ধুরা আছে। যেকোন সমস্যায় আমি তাদের কাছে গিয়ে কাঁদি। নিজের কথা বলি। ফোন রেখে তাদের কথা শুনি। বিশ্বস্ত কাউকে কাউকে বলেও ফেলি হয়ত ” বাঁচতে ইচ্ছে করে না”। অপরপাশ থেকে যখন তাদের ব্যক্তিগত দুঃখবোধ শুনি তখন সত্যি অনুভব করি ” এটা আমি কী বললাম! আমার চেয়েও কত সংগ্রাম করে মানুষ বেঁচে আছেন।” আমি নিজেও ফোনে অনেক আসক্ত কিন্তু ব্যক্তিগত কথা ফেসবুকে শেয়ার করি না কারণ জানি সুযোগ পেলেই অনেকেই দুর্বলতায় আঘাত করবে কিন্তু আমার প্রিয় রুমমেট, প্রিয় বন্ধুরা যারা আমার সামান্য অসুস্থতায় জোর করে হাসপাতালে নিয়ে যায়,যেকোন বিষয়ে সাহস দেয় আমি তাদের কাছেই বলেছি এবং বলব।
.
আগে আমাদের সুফিয়া কামাল হলে নিয়মিত কাউন্সেলিং হত প্রতি সপ্তাহে। আমি যেতাম এবং দেখতাম রুম ভর্তি মেয়েরা বসে আছে। মেয়েদের হলে মিলাদ,সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানেও অনেককে খুঁজে না পাওয়া গেলেও তারা ঠিকই এমন একটা আয়োজনে শামিল হত। কেউ কেউ নিজের ব্যক্তিগত কথা বলতে গিয়ে ব্যাকুল হয়ে কাঁদত। আমার মনে হয় প্রত্যেক হলেই শুরু হওয়া প্রয়োজন।
.
সর্বোপরি, আমি এমন একটা মৃত্যু চাই না যেখানে আমার পরিবারকে সমাজের মানুষ তাচ্ছিল্য করে শোনাতে থাকবে আমার ঠিকানা কোথায় হবে। চাই না এলাকার মানুষের নোংরা কথায় ভারী হোক আমার স্বজনদের অন্তর। পোস্টমর্টেম করতে বসুক আমার দেহ নিয়ে। যে মৃত্যু আমার জাগতিক সত্তাকে ইতিহাসের খাতায় নাম লেখাতে পারল না অমন অসম্মানের মৃত্যু আমি চাই না।

লেখক তুফ্ফাহুল জান্নাত মারিয়া, ঢাকাবিশ্ববিদ্যালয়,

Tuffahul Jannat Maria

About the author

szaman

Add Comment

Click here to post a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

February 2019
S M T W T F S
« Jan    
 12
3456789
10111213141516
17181920212223
2425262728