উপ সম্পাদকীয়

কোটা সংস্কারের প্রজ্ঞাপন জারি করতে আর কত সময় ক্ষেপন!!!

মহান জাতীয় সংসদে প্রধান মন্ত্রী ১১এপ্রিল ২০১৮, আন্দোলনের কারনে কোটা বাতিলের ঘোষনা দেন। সাধারণ শিক্ষার্থদের কোটা সংস্কার আন্দোলনে সর্বস্তরের জনগনের সমর্থন, অংশগ্রহন এমনকি ছাত্রলীগের পদথেকে পদত্যাগ করে সাধারন ছাত্রদের কোটা সংস্কার আন্দোলনে যোগ দেয়। বাংলাদেশে কোটা সংস্কারের পক্ষে আন্দোলন শুরু হওয়ার পর সেটি ভারতেও ছড়িয়ে পড়ে। ১০ই এপ্রিল ভারতের বিভিন্ন স্থানে কোটা পদ্ধতি সংস্কারের জন্য বিক্ষোভ করা হয়। দীর্ঘ লড়াই, সংগ্রাম, আন্দোলনের অভিজ্ঞতায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এটা উপলব্ধি করতে পেরেছেন যে আন্দোলনের বিপরীতে যাওয়া কোন শুভ পদক্ষেপ হবে না, বিশেষত যখন দেখতে পেলেন তার দলের অঙ্গ সংগঠন ছাত্রলীগ থেকে কেউ কেউ পদত্যাগ করে আন্দোলনে যুক্ত হচ্ছে। আন্দোলনের কারনে অনেকটা ক্ষোভেরসাথে তিনি এমন ঘোষনা দেন। এর পর প্রায় অর্ধ বছর পেরিয়ে যাচ্ছে । এখনো প্রজ্ঞাপন জারিতে এতো বিলম্ব হচ্ছে কেন ? কেন ছাত্র সমাজকে তাদের পড়ার টেবিলে ফিরে যেতে বাধা সৃষ্টি করা হচ্ছে। কেন তাদের মধ্যে সন্দেহ সৃস্টি করা হচ্ছে? জাতীয় সংসদের মেয়াদ শেষের পথে। তাহলে তাদের ভিতর সন্দেহের দাবানল বাধবে এবং একসময় তা বিস্ফড়িত হয়ে ভয়ংঙ্কর রূপ ধারন করতে পারে।

১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহনকারীদের সন্তানদের সুবিধা দেওয়ার জন্য কোটা ব্যবস্থা চালু করা হয়। কিন্তু এখন মুক্তিযোদ্ধাদের নাতী-নাতনীদের জন্য এ কোটা প্রযোজ্য হচ্ছে। আকবর আলি খান বলেন, বাংলাদেশের সরকারী চাকরিতে এখন ২৫৮ ধরনের কোটা আছে। প্রথম আলোতে প্রকাশিত তথ্যমতে, নিবন্ধিত মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা দুই-আড়াই লাখ, অর্থাৎ এক হাজার মানুষের মাঝে মুক্তিযোদ্ধার সংখ্যা ১.২ জন বা ১.৫ জন। যা সমগ্র জনসংখ্যার ০.১২/০.১৫ শতাংশ। ০.১২ শতাংশ মুক্তিযোদ্ধার জন্য কোটার পরিমাণ ৩০ শতাংশ। যা হাজারে রূপান্তর করলে দেখা যায়, এক হাজার জনতার মাঝে ১ থেকে ১.৫ (দেড়) জন মুক্তিযোদ্ধার জন্য কোটার পরিমাণ ৩০০।
এছাড়া জেলাভিত্তিক ১০ শতাংশ, নারীদের জন্য ১০ শতাংশ এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জন্য ৫ শতাংশ কোটা আছে। তবে নিয়ম অনুসারে এসব কোটায় যোগ্য প্রার্থী না পায়া গেলে ১ শতাংশ প্রতিবন্ধীদের জন্য বরাদ্দ রয়েছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সংবিধানের ১৯ (১), ২৯ (১) ও ২৯ (২) অনুচ্ছেদ সমূহে চাকুরির ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের সমান সুযোগের কথা বলা হয়েছে। এ কোটা ব্যবস্থার কারনে অনেক মেধাবী প্রার্থীরা চাকরির পরীক্ষা দিতে রাজী হয় না।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওযার পর, ১৯৭২ সালে সরকারী চাকরিতে নিয়োগদানের জন্য তৎকালীন সরকার একটি অস্থায়ী নিয়োগ বিধিমালা জারি করে। ৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭২, মন্ত্রিপরিষদ মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থাপন বিভাগের সচিব এম. এম. জামান স্বাক্ষরিত ইস্ট/আরআই/আর-৭৩/৭২-১০৯(৫০০) নম্বর প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, নিয়োগ লাভের ক্ষেত্রে সকল জেলার নাগরিকদের সুযোগদানের নিমিত্তে প্রথম শ্রেণীর চাকরিতে মেধা কোটা হবে ২০%, বাকী ৮০% জেলার মধ্যে বন্টন করা হবে। এর মধ্যে ৩০ ভাগ মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য, মুক্তিযুদ্ধে নিগৃহীত মহিলাদের জন্য ১০% কোটা সংরক্ষিত থাকবে। পরবর্তী সময়ে বেশ কয়েকবার এই কোটা ব্যবস্থাটি পরিবর্তন করা হয়।

১৯৭৬ সালের ৮ এপ্রিল পরিপত্র নং ইডি/আরআই/আর-৫৬/৭৫/৫২ মূলে মেধা কোটা ২০% থেকে ৪০% করা হয়। মহিলা কোটা ১০% করা হয়। এতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা নিয়ে কিছু বলা হয়নি। ১৯৮৫ সালের ২৮ জুলাই, এমইআর/আর-১/এস-১৩/৮৪-১৪৯(২৫০) স্মারকমূলে ১ম ও ২য় শ্রেণীর পদের মেধাভিত্তিক কোটা বর্তমানে প্রচলিত ৪০% হইতে ৪৫% উন্নীত করা হয়। জেলা ভিত্তিক ৫৫% কোটার মধ্য হতে মুক্তিযোদ্ধাদের ৩০%, মহিলাদের ১০%, এবং উপ-জাতীদের ৫% পদ রাখা হয়। এভাবে চলতে চলতে এক সময় দেখা যায়, আবেদনকারীদের বয়স শিথিল করেও মুক্তিযোদ্ধা কোটায় আর লোক পাওয়া যাচ্ছে না! যখন কোটা পূরণের জন্য মুক্তিযোদ্ধাদের সন্তানদের পাওয়া যাচ্ছিল না, তখন এই ৩০% কোটা পূরণ করতে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার তা মুক্তিযোদ্ধাদের নাতিপুতি পর্যন্ত প্রসারিত করে।

১৯৯৭ সালে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিধান করা হয়, মুক্তিযোদ্ধাদের ৩০ ভাগ কোটা তাদের সন্তানদের দিয়ে পূরণ করা হবে (সম(বিধি-১)এস-৮/৯৫ (অংশ-২-৫৬(৫০০) তারিখ: ১৭/০৩/১৯৯৭)। পরবর্তীতে বিএনপি সরকারের সময় বিধানটির ব্যাখ্যা করে বলা হয়- কোনো কোটায় প্রার্থী না পাওয়া গেলে সেই শূণ্য পদ মেধাকোটা দিয়ে পূরণ করা যাইবে; (সম(বিধি-১) এস-১৪/৯৯-২৮৪, তারিখ ০৪/০৯/২০০২)।

বাংলাদেশে প্রচলিত কোটা ব্যবস্থা নিয়ে সমালোচনা শুধু শিক্ষার্থী বা চাকরি-প্রার্থীদের মাঝেই রয়েছে তেমনটি নয়, বিশেষজ্ঞদেরও মতামত রয়েছে কোটা সংস্কারের পক্ষে। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের প্রেক্ষিতে বিবিসি বাংলাকে দেয়া সাক্ষাতকারে সাবেক মন্ত্রীপরিষদ সচিব আকবর আলি খান বলেন, বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণির সরকারী চাকরিতে মুক্তিযোদ্ধা কোটা পুনর্মূল্যায়ন করা উচিত বলে তিনি মনে করেন। বাংলাদেশে প্রথম শ্রেণীর সরকারি চাকরিতে কোটা প্রথার সংস্কারের দাবিতে সম্প্রতি আন্দোলন বিক্ষোভ করেন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। এমন প্রেক্ষাপটে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকারি চাকরিতে সরাসরি নিয়োাগে কোটার কোনও পদ যোগ্য প্রার্থীর অভাবে পূরণ করা না গেলে, সেসব পদ মেধাতালিকা থেকে পূরণ করা হবে । জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে এ বিষয়ে একটি আদেশ জারি করেছে। নবম থেকে ১৩ তম গ্রেডের (প্রথম ও দ্বিতীয় শ্রেণি) সরকারি চাকরিতে কোনো কোটা না রাখার সুপারিশ করেছে সরকার গঠিত কমিটি। এ-সংক্রান্ত কমিটির প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে জমাও দিয়েছে । কমিটি নবম থেকে ১৩ তম গ্রেডের সব পদে মেধা ভিত্তিতে নিয়োগের সুপারিশ করেছে।

কোটা পৃথিবীর সব দেশেই বিদ্যমান, তবে কোথাও এটা চিরস্থায়ী নয়। কোটা সাধারণত হয় ১০ থেকে ১৫ বছরের জন্য সমাজে পিছিয়ে পড়া বিশেষ কোনো জনগোষ্ঠী কিংবা প্রতিবন্ধিদের পুনর্বাসনের জন্য সরকারি চাকরিতে কিছু সংরক্ষিত আসন থাকে। প্রতিবন্ধি ছাড়া বিশ্বের প্রায় সব দেশেই চাকরিতে কোটা আরোপ করা হয় একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত। এটাকেই বলা হয় কোটাপ্রথা। যেমন ভারতে ১৫ বছরের জন্য দলিত সম্প্রদায়ের কোটা এখন বিদ্যমান, যুক্তরাষ্ট্রে মোট ১০ বছর রেড ইন্ডিয়ানদের জন্য ২ শতাংশ কোটা বিদ্যমান ছিল। সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো দেশেই ১৫ শতাংশের ওপর কোটা বিদ্যমান নেই, সরকারি চাকরিতে নিয়োগের কোটায় বাংলাদেশে কোনো মেয়াদ রাখা হয়নি। যেখানে আমাদের দেশে ৫৬ শতাংশই কোটায় চলে যায়, যা ৪৮ বছর ধরে চলমান! ভাবা যায়?’

সরকারি চাকরিতে কোটা প্রথা নিয়ে শিক্ষার্থী ও চাকরি প্রার্থীদের ক্ষোভ দীর্ঘ দিনের। যোগ্যতার মানদ্বন্দে উপরের সারিতে থেকেও কোটার মারপ্যাঁচে ছিটকে পড়ছেন অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী , সেখানে স্থান করে নিচ্ছেন অপেক্ষাকৃত কম মেধাবীরা- এই আলোচনা অনেকদিন ধরেই চলছে। কোটাপদ্ধতির সংস্কারের দাবিতে দেশজুড়ে গড়ে ওঠেছে তীব্র আন্দোলন। অনেক মুক্তিযোদ্ধারা এবং তাদের সন্তানরাও চান কোটাপ্রথা সংস্কার হোক। তারা বলেন আমরা আমাদের মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে চাকরি পেলেও মানুষ মনে করে কোটায় চাকরি হয়েছে, কোটায় ভর্তি হয়েছে। সমাজে মাথা নিচু হয়ে যায়। মেধার মূল্যায়ন করেনা। আর একটা কথা না বল্লেই নয়, দেশ স্বাধীন করারর জন্য যে ৩০লক্ষ শহীদ হয়েছে তাদেরকে আমরা কি দিলাম !!! তাদের পরিবার এমন সদস্য হারিয়েছে হয়তো সেই ছিল তাদের পরিবারের একমাত্র সম্বল। সে সব পরিবার নিস্ব হতে চলেছে। যারা জীবন উৎসর্গ করলো তাদেরকে আগে কোটার আওতায় আনা উচিত। কারন যারা জীবিত আছে তারাতো তাদের পরিবারের জন্য কিছু না কিছুতো করতে পারবে। কাজেই আর সময়ক্ষেপন না করে অতিদ্রæত কোটা সংস্কারের প্রজ্ঞাপন জারি করুন।

About the author

szaman

Add Comment

Click here to post a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আর্কাইভ ক্যালেন্ডার

November 2018
S M T W T F S
« Oct    
 123
45678910
11121314151617
18192021222324
252627282930